কুরবানির পশুর হাট জমজমাট

রাজধানীর গাবতলী ও সারুলিয়া স্থায়ী হাটসহ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৯ অস্থায়ী হাট কুরবানির পশুতে ভরে গেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক ও ট্রলারে এসেছে এসব পশু। হাটগুলোয় দেশি গরুর সংখ্যাই বেশি। ভারতীয় গরু খুবই কম। তবে ক্রেতাও কম। যারা হাটে আসছেন, তারা ছোট ও মাঝারি আকারের পশুতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকে হাট ঘুরে ঘুরে দাম যাচাই করছেন। অনেক হাটে বিক্রি শুরু হয়েছে। অফিস ছুটি শুরু হলে আজ বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে পুরোদমে বিক্রি জমবে বলে মনে করছেন ইজারাদার ও ব্যবসায়ীরা। এখন পর্যন্ত হাটে গরু-খাসির দাম অনেকের কাছে বেশি মনে হলেও বিক্রি বাড়লে দামের বিষয়টি খোলাসা হবে।যদিও বিক্রেতারা দাবি করছেন, গো-খাদ্যের দাম বেশি এবং বন্যার কারণে এবার দাম বেড়েছে। অবশ্য তারা মনে করছেন করোনার ধকল কাটিয়ে গতবারের চেয়ে এবার বিক্রি বাড়বে। ঢাকার হাটে এসেছে পুতিন, হিরো আলম, ক্যাপ্টেন, ব্ল্যাক ডায়মন্ড, ডাক্তার, নিরব, রাজাবাবু, কালাপাহাড়, টাইগারসহ বাহারি নামের গরু। আছে চেয়ারম্যান নামের খাসিও। এসব গরুতে ক্রেতাদের চোখ আটকালেও দরদাম চলছে। অনেক হাটে লাখ টাকার নিচে হাঁকছেন না গরুর দাম। আছে ১৫ লাখ টাকার গরুও। উট, দুম্বা উঠেছে কয়েকটি হাটে। গতকাল বুধবার গাবতলী, আফতাবনগর, মেরাদিয়া, রহমতগঞ্জ, নয়াবাজার পশুর হাট ঘুরে বেচাকেনার এমন চিত্র মিলেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীতে এবার কুরবানির পশুর চাহিদা ২৫ লাখের মতো। গরুর পর রাজধানীর কয়েকটি খামারে এবারো আমদানি করা হয়েছে উট-দুম্বা। এরই মধ্যে অধিকাংশ বিক্রিও হয়ে গেছে। প্রতিটি উট ১৫ থেকে ১৮ লাখ আর দুম্বা বিক্রি হচ্ছে দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকায়। দুই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের রাজস্থান থেকে আসা উটটি এখন রামপুরার সামারাই ক্যাটেল ফার্মে। নাম দেয়া হয়েছে হুররাম। দাম হাঁকা হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা। বিক্রেতা বলছেন, উটটি কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে। দরদামও করছেন। মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রোতে গত বছর একটি উটও বিক্রি হয়নি। অথচ এবার তিনটি উট বিক্রি হয়েছে। সর্বশেষ উটটি বিক্রি হয়েছে ১৮ লাখ টাকায়। মধ্যপ্রাচ্যর আরেক পশু দুম্বা। তিন থেকে চারটি খামারে দুম্বা বিক্রি হচ্ছে। উট-দুম্বা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেছেন অনেকে।

গাবতলী : ঈদের শেষ মুহূর্তে কেনাবেচা জমে উঠেছে রাজধানীর সবচেয়ে পুরনো কুরবানির পশুর হাট গাবতলীতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েই চলছে। কেউ কিনছেন, কেউ দরদাম করছেন, আর বনিবনা না হলে দেখছেন অন্য গরু। গতকাল দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত গাবতলী পশুর হাটে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এবারের ঈদে বড় গরুর দেখা মিলছে রাজধানীর গাবতলীতে। এসব গরুর বাহারি নাম রাখা হয়েছে। যার মধ্যে ক্যাপ্টেন, ব্ল্যাক ডায়মন্ড, কালা পাহাড়, গরিবের আশা, ডাক্তার, লাল টাইগার উল্লেখযোগ্য। গাবতলীতে পর্যাপ্ত পশুর সরবরাহ রয়েছে।

হাট ঘুরে দেখা গেছে, গরু ছাড়াও মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা উঠেছে নানা আকার ও রঙের। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এ বছর গরুর দাম মণে ১০ হাজার টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় পশু পালনে খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কুরবানির বাজারে। হাটে পশুর যে দাম উঠছে তাতে লোকসানের শঙ্কা রয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।

* ছোট ও মাঝারি গরুর কদর বেশি * পুতিন, বাইডেন, হিরো আলম, নিরব, রাজাবাবু, কালাপাহাড়, টাইগারসহ বাহারি নামের গরু **

যদিও বিক্রেতারা দাবি করছেন, গো-খাদ্যের দাম বেশি এবং বন্যার কারণে এবার দাম বেড়েছে। অবশ্য তারা মনে করছেন করোনার ধকল কাটিয়ে গতবারের চেয়ে এবার বিক্রি বাড়বে। ঢাকার হাটে এসেছে পুতিন, হিরো আলম, ক্যাপ্টেন, ব্ল্যাক ডায়মন্ড, ডাক্তার, নিরব, রাজাবাবু, কালাপাহাড়, টাইগারসহ বাহারি নামের গরু। আছে চেয়ারম্যান নামের খাসিও। এসব গরুতে ক্রেতাদের চোখ আটকালেও দরদাম চলছে। অনেক হাটে লাখ টাকার নিচে হাঁকছেন না গরুর দাম। আছে ১৫ লাখ টাকার গরুও। উট, দুম্বা উঠেছে কয়েকটি হাটে। গতকাল বুধবার গাবতলী, আফতাবনগর, মেরাদিয়া, রহমতগঞ্জ, নয়াবাজার পশুর হাট ঘুরে বেচাকেনার এমন চিত্র মিলেছে।

গাবতলী পশুর হাটে পাবনা থেকে ১১টি গরু এনেছেন খামারি মো. শিরাজুল ইসলাম। গরু নিয়ে এসেছেন গত সোমবার। মঙ্গল ও বুধবার এই দুই দিনে ৪টি গরু বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, আশানুরূপ দাম পাচ্ছি না। খরচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত বছরের তুলনায় এবার তার অর্ধেকও লাভ হবে না।
আরেক খামারি আবুল কাশেম বলেন, আমি ১৫টি গরু নিয়ে গাবতলী এসেছি। গরুগুলো মাঝারি আকারের। এবার গরুর খাবারের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ক্রেতারা এটা বুঝতেই চাচ্ছেন না।

মিরপুর থেকে গাবতলীতে গরু কিনতে আসা সোহেল মিয়া বলেন, গরুর দাম এবার অনেক বেশি মনে হচ্ছে। ভেবেছিলাম ১ লাখ টাকার মধ্যে একটি গরু কিনব। কিন্তু দেখলাম গত বছর যে গরু এক লাখ টাকা ছিল, সেটা এবার ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার উপরে দাম চাওয়া হচ্ছে। রাজবাড়ীর পাংশা থেকে গাবতলী হাটে আনা হয়েছে ‘চেয়ারম্যান’ নামে খাসি। ৮৫ থেকে ৯৫ কেজির চেয়ারম্যানের দাম ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা হাঁকছেন এর মালিক।

রহমতগঞ্জ ও নয়াবাজার : চকবাজারের রহমতগঞ্জ খেলার মাঠে বসেছে ৫৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার বড় গরুর হাট। হাটে সারাদেশ থেকে ছোট-বড় নানা আকারের গরু ও ছাগল আনা হয়েছে। গতকাল বুধবার আনুষ্ঠানিক বিক্রির প্রথমদিন তেমন ক্রেতার আগমন দেখা যায়নি। যারা আসছেন, তারা শুধু দেখেই চলে যাচ্ছেন। গরু কিনে রাখার মতো জায়গা না থাকা এবং পশুর খাবারের দাম বেশি হওয়ায় পরে কিনবেন বলে জানা যায়। এছাড়া হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানতে ও মাস্ক পরতে দেখা যায়নি। হাটজুড়ে নানা আকৃতির গরু দেখা গেছে। পুতিন, কালাপাহাড়, টাইগার, হিরো আলম বা বাদশাসহ নানা নামে বড় গরুগুলোকে আখ্যায়িত করছেন। এদের মধ্যে কোনোটার ওজন সর্বোচ্চ ২৮-৩০ মণ, কোনোটার ওজন ২৪ মণ আবার কোনোটার ওজন ৪-৫ মণ। প্রতি মণ ৪০ হাজার টাকা ধরে কেউ কেউ দাম নির্ধারণ করছেন।

ইউনূস নামে নগরকান্দা থেকে আসা এক বিক্রেতা বলেন, ১৫ বছর থেকে ঢাকায় কুরবানির ঈদে গরু বিক্রি করে আসছি। আমি ১৮টি গরু কিনে এনেছি। আশা করছি ঈদের আগে বিক্রি করতে পারব। দাম কেমন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ক্রেতার ওপর নির্ভর করবে দাম। বেচাকেনার প্রথমদিন ক্রেতা নেই। সামনের দুদিনে ক্রেতার ওপর নির্ভর করবে দাম কেমন হবে। তবে বেশি টাকা দিয়ে নিজ এলাকা থেকে গরু কিনে আনতে হয়েছে।হাজী মামুন বেপারী নামে এক ক্রেতা বলেন, আজ এসেছি গরু দেখতে। কিনব ঈদের আগের দিন। কারণ গরু রাখার জায়গা নেই।

এদিকে রহমতগঞ্জ খেলার মাঠে কুরবানি পশুতে পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় হাটের পাশের রাস্তায় সরকারি বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই পশু রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে রাস্তায় পাঁচটি গরু নিয়ে বিক্রির জন্য অপেক্ষমাণ আলমগীর হোসেন বলেন, আমি ফরিদপুর থেকে এসেছি। হাটে জায়গা পাইনি। তাই হাট কর্তৃপক্ষ রাস্তায় জায়গা করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির সহসভাপতি ও টিম ম্যানেজার হাজী শরিফ মাহমুদ বলেন, প্রতি বছর পশুর হাটের টাকা দিয়ে ক্লাব চলে। হাটের টেন্ডার নেয়ার সময় বলা আছে, মাঠ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পশুর হাট বসানো যাবে।

কুরবানির হাটকে কেন্দ্র মৌসুমি বিক্রেতাদের গো-খাদ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে। রহমতগঞ্জ হাটের পাশে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাব্বির হোসেনকে পশুর খাবার বিক্রি করতে দেখা যায়। সে জানায়, প্রতি কেজি ভুট্টার ভুসি ৭০ টাকা, গমের ভুসি ৫০ টাকা, খেসারির ভুসি ৮০ টাকা, ছোলার খোসা ৬০ টাকা, ধানের তুষ কেজি ২৫ টাকা, ঘাস এক আঁটি ৫০ টাকা ও ধানের খড় আঁটিপ্রতি ২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে পুরান ঢাকার নয়াবাজারের হাটটি তুলনামূলকভাবে ছোট। সেখানেও গরু-ছাগল উঠেছে। ক্রেতাদের আনাগোনা এবং দরদাম চললেও বিক্রি সেভাবে জমেনি।

আফতাবনগর ও মেরাদিয়া : জমে উঠেছে আফতাব নগর ও মেরাদিয়া কুরবানির হাট। গতকাল সকালে ভিড় দেখা না গেলেও বিকালের দিকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে ঢাকার হাট দুটি। ঢাকার সবচেয়ে বড় পশুর হাট আফতাবনগরে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে খুঁটিতে বাঁধা রয়েছে গরু। হাটে প্রবেশ করছে শত শত মানুষ। তবে বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীই বেশি। তবে হাট-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বুধবার রাত থেকেই বেচাকেনা জমে উঠবে।
গতকাল আফতাবনগর হাটে কথা হয় নাটোরের সিংড়া থানার মেরাজ নামে এক গরুর বেপারির সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে জানান, আগে থেকেই ভালো জায়গা পেতে গত শুক্রবার রাতেই আফতাবনগর হাটে আসেন তিনি। সিংড়া থেকে ২৫ হাজার টাকা ভাড়ায় এক ট্রাকে দুটি ভারতীয় বোল্ডারসহ ছয়টি গরু হাটে এনেছেন।

তিনি আরো জানান, অনেক দর্শনার্থী থাকলেও ক্রেতা কম। এত দিনে গতকাল মাত্র আড়াই লাখ টাকায় তার একটি গরু বিক্রি হয়েছে। তিনি আশা করছেন বুধবার রাত থেকে বেচাকেনা বাড়বে। এ হাটে কথা হয় প্রায় ১ টন ওজনের অস্ট্রেলিয়ান ক্রস গরুর মালিক পাবনার আতাইকুলার স্বপন আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, গত শনিবার রাতে ৩০ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়ায় ১০টি গরু নিয়ে হাটে আসেন তিনি। এর মধ্যে তার ক্রস গরুটি সবচেয়ে বড়। প্রতিদিন ঘাস ছাড়াও ৫০০ টাকার বেশি দানাদার খাবার খায় এটি। গরুটির দাম চাইছেন ৮ লাখ টাকা।

আফতাবনগর হাটে তথ্য কেন্দ্রে কর্মরত আপন ইসলাম ইপু বলেন, রাজধানীর আফতাবনগর হাটে চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নাটোর, পাবনা ও ফরিদপুর এলাকা থেকে গরু আসছে। ক্রেতাদের সুবিধার্থে তথ্য কেন্দ্র ছাড়াও ১২টি ইজারা কাউন্টার করা হয়েছে হাটজুড়ে। এতদিন তেমন ক্রেতা না থাকলেও আজ (গতকাল) থেকে হাটে বেচাকেনা শুরু হয়েছে।