আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সমীকরণ কী দাঁড়াচ্ছে?

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার আগেই আফগানিস্তানের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান যোদ্ধারা। ২০ বছর পর হঠাত্ করে কট্টর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসায় প্রতিবেশী দেশগুলো বিশেষত এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অনেকটাই বদলে গেছে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, ভারত, চীন ও ইরানের বড় স্বার্থ রয়েছে আফগানিস্তান ঘিরে। তালেবান আবারও ক্ষমতায় আসায় এসব দেশ চাইছে তাদের সঙ্গে একটি সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে।

তালেবান ক্ষমতা দখলের পর অনেক দেশ তাদের দূতাবাস বন্ধ করে নাগরিকদের ফেরাতে তত্পর হলেও চীন তাদের দূতাবাস এখনো খোলা রেখেছে। তারা তালেবান নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং গত সপ্তাহে জানান, তালেবানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তালেবান বেইজিংয়ের সঙ্গে সুম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

প্রতিশ্রুতির পরও প্রতিশোধমূলক আচরণ বন্ধ হয়নি তালেবানদেরচীনা নেতৃত্ব বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিল যে, তালেবান ক্ষমতা নিলে আফগানিস্তান ইসলামি জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে। অতীতে তারা উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইস্ট তুর্কেস্তান মুভমেন্ট (ইটিআইএম) এর আশ্রয়দাতা ছিল। যারা চীনের শিনজিয়াং প্রদেশে স্বাধীন ইস্ট তুর্কেস্তান রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। এই সংগঠনের অনেক সদস্য আফগানিস্তানে রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা দখলের আগেই গত মাসে তালেবান নেতারা চীন সফরে গিয়ে আশ্বাস্ত করেছে যে, তারা চীনের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে দেবে না। তারা আফগানিস্তান পুনর্গঠনে চীনের সহায়তা চায়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে বসার পর তালেবানের এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে না এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে আপাতত তালেবানের ওপর আস্থাশীল চীন বলছে, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যে তালেবান শাসন আমরা দেখেছি, তার থেকে তারা এখন অনেক বেশি ‘স্পষ্ট এবং বাস্তবিক ভাবে’ ভাবছে।

তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর কঠিন সমীকরণের মুখে পড়েছে ভারত। আফগানিস্তান থেকে ভারতীয় নাগরিকদের সরিয়ে আনা অব্যাহত রয়েছে। দুই দশক ধরে তালেবানবিরোধী অবস্থান বজায় রেখেছে ভারত সরকার। কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তালেবানের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় সে ব্যাপারে সেখানে আলোচনা হয়। ভারত সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে’কে বলেন, অন্তর্বর্তীকালে তালেবান কী করে আমরা সেটা খোলা মনে নজর রাখব। ২০ বছর পর তাদের কী পরিবর্তন এসেছে সেটাও মূল্যায়ন করব।

‘মার্কিন অস্ত্রে ভর করে আরও ভয়ানক হতে পারে তালেবান’কিছু পর্যবেক্ষক সতর্ক করে বলছেন, তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটিতে ভারতের বিনিয়োগ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। গত দুই দশকে সেখানে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে ভারত। তারা সাবেক আফগান সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। হায়দরাবাদের কৌটিল্য স্কুল অব পাবলিক পলিসির পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ শান্তি ম্যারিয়েট ড’সুজার মতে, ভারত এখন উভয় সংকটে পড়েছে।

নিরাপত্তা ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখেও রয়েছে ভারত। আফগানিস্তানের ঘাঁটি থেকে ভারতবিরোধী জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জয়শ-ই-মোহাম্মদ কর্মকাণ্ড চালিয়ে এসেছে। বিভিন্ন সময় ভারতে হামলা চালিয়েছে। তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর এসব সংগঠন আরো বেশি সাহস সঞ্চার করতে পারে। তাদের ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার সুযোগ আরো বাড়তে পারে।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের জন্য তালেবান বড় মাথা ব্যথার কারণ। সেখানকার ইসলামিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এর আগেও তালেবান ও আল-কায়দার সম্পর্ক ছিল। ক্ষমতায় এসে তালেবান তাদের সমর্থন দিক—সেটি কখনো ভারত চাইবে না। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনীতা বেহেরা ডিডব্লিউ’কে বলেন, কৌশলগতভাবে এটি পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে তালেবান নেতৃত্বের সম্পর্ক কতটা বিকশিত হয় এবং তারা কাশ্মীরে প্রক্সি যুদ্ধে ইসলামাবাদকে কতটা সহায়তা করে তার ওপর নির্ভর করছে।

 

US left billions in weapons in Afghanistan, with Black Hawks in Taliban's  handsআফগানিস্তানে তালেবানের নিয়ন্ত্রণকে পাকিস্তান অত্যন্ত চড়ামূল্যে অর্জিত বিজয় বলেই মনে করছে। পাকিস্তান সবসময় মনে করে কাবুলে পাকিস্তান-বান্ধব একটি সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডনে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বিশ্লেষক ড. আয়েশা সিদ্দিকা বিবিসিকে বলেন, আফগানিস্তানে পাকিস্তান যে তাদের পছন্দমতো একটি সরকার চাইছে তাতে সন্দেহ নেই। তারা কাবুলে এমন একটি সরকার চাইছে যেখানে তালেবানের প্রাধান্য থাকবে। কারণ পাকিস্তান মনে করে তালেবান সবসময় পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে এবং আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব তাতে খর্ব হবে।

পাকিস্তানের বিশ্বাস, অতীতে আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেয়ে ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী তত্পরতায়, বিশেষ করে বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদে মদত দিয়েছে এবং কাবুলে আশরাফ ঘানি সরকার তাতে সাহায্য করেছে। আপাতদৃষ্টিতে পাকিস্তান সরকার খুশি হলেও পাকিস্তানের একাংশের আশঙ্কা আফগানিস্তানে তালেবানের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের ভেতর সন্ত্রাসী এবং ধর্মীয় কট্টরপন্থি গোষ্ঠীদের উত্সাহিত করবে, শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ

অন্য দিকে পাকিস্তান আশা করে আফগানিস্তান মাল্টিবিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরে (সিপিইসি) যোগ দেবে। একই সঙ্গে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনশিয়েটিভেও কাবুলকে চায় ইসলামাবাদ। যেটা বেইজিং তালেবান সম্পর্কের বিকাশের ওপর নির্ভর করবে।

যুক্তরাষ্ট্র সেনা সরিয়ে নেওয়াতে খুশি আফগানিস্তানের আরেক প্রতিবেশী দেশ ইরান। তবে তারা দেশটির স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বর্তমানে সাড়ে সাত লাখ আফগান শরণার্থী ইরানে অবস্থান করছে। তালেবান ক্ষমতায় আসায় এই সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা করছে দেশটি। এছাড়া অতীতে ইরান-তালেবান সম্পর্ক কখনোই আন্তরিক ছিল না। এ অবস্থায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থিতিশীল আফগানিস্তান এ অঞ্চলে উদ্বেগ কিছুটা হলেও কমাতে পারে।