প্রাচীন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার একাল-সেকাল

বিভিন্ন যুগে দরসে নিজামিতে পরিবর্তন এসেছে। যুগের দাবিতে এই শিক্ষাক্রম থেকে কিছু বই বাদ পড়েছে এবং কিছু বই পাঠ্যভুক্ত হয়েছে। কিন্তু পাঠ্যক্রমের মৌলিক অবকাঠামোতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। অথচ প্রত্যেক যুগে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা এবং যুগের চাহিদা অনুসারী জ্ঞানগত ও শাস্ত্রীয় সৌকর্য অক্ষুণ্ন রয়েছে। প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু শিক্ষক ছিলেন, যারা তাদের পরিশ্রমী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপযোগী বিশেষ পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাদের জন্য কিতাব লিখেছেন, মাসয়ালার সমাধান করেছেন, তাদের একক চেষ্টায় শিক্ষার্থীদের যোগ্যতায় ঔজ্জ্বল্য এবং প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসের কোনো যুগই এমন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও পণ্ডিত আলেম শূন্য ছিল না। প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল এটাই। কিন্তু বর্তমানে প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার স্থানে আধুনিক যে শিক্ষাব্যবস্থা জায়গা করে নিয়েছে, তা শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধিক্যের পরও প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার মতো নিজেকে ফলপ্রসূ প্রমাণ করতে পারেনি। প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো জ্ঞানের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা, শিক্ষকের প্রতি সম্মান এবং জ্ঞানার্জনের প্রকৃত আগ্রহ। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে বস্তুবাদেরই রাজত্ব তা শিক্ষাকে জীবিকা উপার্জনের মাধ্যমে পরিণত করেছে।

ইসলামের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বিস্ময়কর একটি দিক হলো যখনই মানবীয় জ্ঞান ধর্মচিন্তা ও বিবেকের ওপর প্রাধান্য লাভ করেছে, ছাত্র-শিক্ষক-শাসকদের ভেতর ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব লোপ পেয়েছে, দ্বিনি ইলম অন্যান্য জ্ঞানের মতো একটি শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে, জ্ঞানচর্চা পেশার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং আলেম ও শাসকদের ভেতর তোষামোদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তখনই শাসকরা জনগণের ওপর তাদের প্রভাব হারাতে থাকে এবং রাষ্ট্রীয় কাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। গত কয়েক শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর কাছে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর পতনের পেছনে ইসলামী শিক্ষার পশ্চাৎপদতা দায়ী কি না তা গবেষণা করে দেখার দাবি রাখে। একটি গতিশীল ও যোগ্য জাতি কিভাবে স্থবির ও অক্ষমতার মুখোমুখি হলো, সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

হিজরি ১৩ শতকে মুসলিমরা ইসলামী মূল্যবোধ ছেড়ে পশ্চিমা মূল্যবোধ গ্রহণ করতে শুরু করে। সে সময় ভারতবর্ষে মুসলিম শক্তি কয়েকটি অঞ্চল ও লালকেল্লায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ইংরেজদের আগ্রাসন ও দেশীয় রাজনীতিতে তাদের হস্তক্ষেপ ক্রমেই প্রবল হতে থাকে। তখন ভারতীয় মুসলিমরা আর্থিক, চারিত্রিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও (ধর্ম) বিশ্বাসের অঙ্গনে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হচ্ছিল। ফলে একদিকে মুসলিম সমাজের পথপ্রদর্শক আলেমদের একটি দল ইসলাম ও মুসলমানের অস্তিত্ব রক্ষা, ইসলামী মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরা এবং মুসলিমদের পূর্বসূরি আলেমদের পদাঙ্ক অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যস্ত ছিল, অন্যদিকে আলেমদের আরেকটি দল দর্শনের আলোকে স্রষ্টাবিষয়ক আলোচনা এবং যুক্তিবিদ্যার আলোকে ধর্মবিশ্বাসের পর্যালোচনায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। তাঁদের হাদিস, তাফসির ও আধ্যাত্মিক আলোচনায় ধর্মতত্ত্বের প্রভাব ছিল। যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের প্রভাব আলেমদের জীবনচরিত ও অবদান এবং তাদের দীক্ষায় লক্ষ্য করা যায়। ভারতবর্ষে মুসলমানের রাজনৈতিক পতনের যুগে ইরানিদের উত্থান এবং শাসকদের হস্তক্ষেপের প্রভাবে আলেমদের কেউ কেউ ওহিভিত্তিক জ্ঞানকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতেন। যে কারণে আলেমরা দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার পুরনো গ্রন্থগুলোর ব্যাখ্যা গ্রন্থ, পুনর্বিন্যাস ও সংক্ষেপণ রচনা করছিলেন এবং এ বিষয়ে নতুন নতুন কিতাব রচনায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। তখন পূর্ববর্তী আলেমদের রচিত গ্রন্থের সঙ্গে নতুন রচিত কিতাবগুলোও পাঠ্য করা হয়েছিল। ফলে পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার কিতাব বেড়ে গেল। পাঠ্য হিসেবে যুক্তিবিদ্যার ১৫টি বই পড়ানো হতো। বিপরীতে অলংকার শাস্ত্রের বই ছিল মাত্র দুটি। অধিক হারে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা চর্চার কারণে লেখকের অন্য কিতাবগুলোর বর্ণনা পদ্ধতিও হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য ও সংশয়পূর্ণ।

এ সময় দরসে নিজামির আরো বড় যে ক্ষতিটি হয়, তা হলো তা থেকে ইতিহাস, ভূগোল, কোরআনের অলৌকিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা পাঠকের চিন্তার গণ্ডিতে বিস্তৃত করে তা পাঠ্য তালিকায় ছিল না। অথচ শিক্ষার্থীদের ভেতর যোগ্যতা সৃষ্টি এবং সামাজিক কল্যাণে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্ব। একইভাবে দরসে নিজামিতে আরবি সাহিত্যের যে অংশটুকু ছিল তাও ছিল প্রাচীনকালের এবং অবিশ্বাসীদের রচিত। যেমন ‘নাফহাতুল ইয়ামান’, ‘সাবয়ায়ে মুয়াল্লাকাত’, ‘মাকামাতে হারিরি’, ‘দিওয়ানে মুতানাব্বি’ ও ‘দিওয়ানে হামাসা’। গ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় এই পাঠ্যক্রমের রচয়িতারা আরবি সাহিত্যকে একটি সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতেন। তাদের দৃষ্টিতে সাহিত্য হলো কিছু শব্দ মুখস্থ করার নাম, মানবজীবনের অভিব্যক্তি এবং প্রেরণগুলো সেখানে থাকা আবশ্যক নয়। এ কারণেই এই পাঠ্যক্রমে ‘শব্দবিশ্লেষণ’ ও আরবি ব্যাকারণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাক্যের অলংকার, সৌন্দর্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনার প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে এই পাঠ্যক্রমের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাহিত্যরুচি, লেখালেখি ও সমালোচনার যোগ্যতা গড়ে ওঠে না। একই সঙ্গে তাদের ভেতর চিন্তাগত স্থবিরতা রয়েছে।

উল্লেখ্য যে আরবি সাহিত্যের এসব গ্রন্থ সব মাদরাসার পাঠ্য ছিল না। কোথাও ‘নাফহাতুল ইয়ামান’ ও ‘মাকামাতে হারিরি’ পড়ানো হতো, কোথাও ‘দেওয়ানে মুতানাব্বি’, কোথাও ‘মুআল্লাকাত’ আবার কোথাও ‘দেওয়ানে হামাসা’ পাঠ্য ছিল। অন্যদিকে প্রায় সব জায়গায় ‘মানতিক’ (যুক্তিবিদ্যা), ‘নাহু-সরফ’ (আরবি ব্যাকারণ), ‘ফিকহ’ (আইন), ‘উসুলে ফিকহ’ (আইন প্রণয়নের মূলনীতি) বিষয়ে একই কিতাবাদি পড়ানো হতো। অবশ্য হাদিসের পাঠদানে ফিকহের রং প্রবল ছিল।

‘তামিরে হায়াত’ থেকে আবরার আবদুল্লাহ