গর্ভবতী ও প্রসূতি মৃত্যু কমায় বাড়ছে নারীর গড় আয়ু

দেশে নারীর গড় আয়ু বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২০’ হালনাগাদ জরিপে নতুন তথ্যমতে, পুরুষের গড় আয়ু হয়েছে ৭১ বছর দুই মাস। আর নারীদের গড় আয়ু ৭৪ বছর পাঁচ মাস।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২১’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে নারীদের গড় আয়ু ৭৫ বছর, যেখানে পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট প্রকাশ জুনের শেষে আর জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন প্রকাশ পায় এপ্রিল মাসে। উভয় প্রতিবেদনেই নারীর গড় আয়ু বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে। এতদিন বিশ্বময় নারীর গড় আয়ু বেশি থাকলেও বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীর গড় আয়ু কম ছিল।

 

কীভাবে বাড়ল নারীর গড় আয়ু—এমন প্রশ্নের জবাবে পপুলেশন কাউন্সিল বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ওবায়দুর রব ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের দেশে ১০-১৫ বছর আগে জীবিত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে বছরে ৮ থেকে ১০ হাজার প্রসূতি মারা যেতেন। এখন তা কমে ৫ থেকে ৬ হাজারে মৃত্যুতে এসে দাঁড়িয়েছে। এই হার আরো কমবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। মৃত্যুহার কমেছে। গড় আয়ু বেড়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ব জুড়ে পুরুষ তুলনায় নারী বেশি বাঁচে। কিন্তু বাংলাদেশেই এর ব্যতিক্রম ছিল। দেশে ৮০ দশকে মানুষর গড় আয়ু ছিল ৪০ থেকে ৪২ বছর। তখন নারীর গড় আয়ু পুরুষের তুলনায় কিছু কম ছিল।

 

৯০ দশক থেকে প্রসূতির মৃত্যু কমে আসতে শুরু করলে নারীর গড় আয়ু বাড়তে থাকে।’ ওবায়দুর রব বলেন, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ছেলে শিশু জন্মের হার বেশি। কিন্তু এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ছেলে শিশু বেশি মারা যায়। ফলে পাঁচ বছর পরে ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে সমতা চলে আসে। আবার সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলেরা বেশি মারা যায়। ১৮ বছর থেকে ৪৯ বছরের প্রজননক্ষম নারীর মধ্যে সন্তান জন্ম দিয়ে মৃত্যু হওয়ার হার বেশি। চিকিত্সাসেবার উন্নয়নের ফলে এই হার কমে নারীর গড় আয়ু বাড়তে থাকে।

সমাজ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসে বাংলাদেশ অনেক সাফল্য অর্জন করেছে এটি একটি প্রধান কারণ। এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশের চেয়ে এগিয়েছে। এর মূলে আমাদের চিকিত্সাব্যবস্থার উন্নয়ন। তাছাড়া নারীর প্রতি সচেতনতা বেড়েছে। নারী নিজেও সচেতন হয়েছে। এই অবস্থান ধরে রাখতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, নারীর পুষ্টির ওপর গুরুত্বারোপসহ প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি করে সমাজে সমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন রকমের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপার্য অধ্যাপক এ কে এম নূর-উন-নবী বলেন, গবেষণায় দেখা যায়—পুরুষের তুলনায় নারী বেশি শক্তিশালী এবং দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও বেশি টিকে থাকতে পারে। আবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নারীরা মানিয়ে নিতে পারে বেশি। আমরা দেখতে পাই করোনায় নারীর আক্রান্ত হওয়া এবং মারা যাওয়ার হারও অনেক কম। ৮০ দশকের আগে নারীর মৃত্যুর আর একটি কারণ পুষ্টিহীনতা বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক নূর-উন-নবী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ফলে নারীর ইস্যুগুলো সামনে আসছে। সরকারের নারীবান্ধব কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন আজ দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া এমনকি বিশ্বময় প্রশংসিত হচ্ছে। নারী উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়েও এগিয়ে। এসব বিষয় নারীর গড় আয়ু বৃদ্ধিতে জোরালো ভূমিকা রাখছে ।

গড় আয়ু আরও বেড়েছে